আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : মঙ্গলবার ২৫শে আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৮ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
গ্যাস-সংকটে চিনির উৎপাদন কমেছে, সপ্তাহে দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ টাকা
দেশে গ্যাস-সংকটের কারণে চিনি পরিশোধন কারখানাগুলোর উৎপাদন কমে গেছে। ফলে বাজারে চাহিদা অনুযায়ী চিনির সরবরাহ হচ্ছে না। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি চিনির দাম বেড়েছে প্রায় ১০ টাকা।
বাজার সামাল দিতে কোম্পানিগুলো এখন পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে নগদ টাকা ছাড়া মিলগেট থেকে চিনি বিক্রি করছে না। এতে বাজারে সরবরাহ আরও কমে দাম বাড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১২০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগেও একই চিনি ১০৫ থেকে ১১০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যেত।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে দেশের বাজারে চিনির দাম প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোম্পানি ও পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার প্রভাবেই খুচরা বাজারে চিনির দাম বেড়েছে।
বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি ৫০ কেজির এক বস্তা চিনি বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ৪০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি চিনির দাম পড়ছে ১০৮ থেকে ১১০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মিলগেট থেকে তাঁরা প্রতি কেজি চিনি প্রায় ১০৫ টাকা দরে কিনছেন। দুই সপ্তাহ আগেও ৫০ কেজির এক বস্তা চিনির দাম ছিল প্রায় ৫ হাজার টাকা।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত বড় ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা কোম্পানির কাছ থেকে চিনি কিনতে আগেই টাকা পরিশোধ করে ‘সাপ্লাই অর্ডার’ বা এসও সংগ্রহ করেন। পরে ওই অর্ডারের কাগজ দেখিয়ে মিলগেট থেকে চিনি খালাস করা হয়।
বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বড় ও পরিচিত ব্যবসায়ীদের অনেক সময় কোম্পানিগুলো বাকিতে এসও দিয়ে থাকে। কিন্তু চলমান গ্যাস-সংকটের কারণে এখন সেই ব্যবস্থা অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, কোম্পানিগুলো চাহিদার তুলনায় কম পরিমাণে চিনি বাজারে ছাড়ছে। ফলে পাইকারদের কাছে নগদ টাকায় চিনি বিক্রি করা হচ্ছে এবং বাজারে সরবরাহ কমে যাচ্ছে।
দেশে মূলত আমদানি করা অপরিশোধিত চিনি পরিশোধন করে বাজারে সরবরাহ করা হয়। এই পরিশোধন প্রক্রিয়ায় শিল্পকারখানায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাসের প্রয়োজন হয়।
গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারে চিনির সরবরাহের ওপর।
একসময় দেশের ছয়টি শিল্পগোষ্ঠী চিনি পরিশোধনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে বড় তিনটি প্রতিষ্ঠান এই খাতে রয়েছে। এগুলো হলো মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই), সিটি গ্রুপ ও আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি।
ব্যবসায়ীদের মতে, এই তিন প্রতিষ্ঠানের যেকোনো একটির উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের বাজারে চিনির সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে।
চিনি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের বাজারে দাম বাড়ার পেছনে শুধু গ্যাস-সংকট নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বাড়ারও প্রভাব রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত চিনি ও পরিশোধিত সাদা চিনির দাম সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। একই সময়ে দেশীয় পরিশোধন কারখানাগুলো গ্যাস-সংকটে উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ায় দেশের বাজারে সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
২০ আগস্ট রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের অন্যতম প্রধান চিনি উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ ভারত। উৎপাদন ও সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশটিতে গত দুই মাসে চিনির দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ভারত সরকার ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ১০ লাখ টন অপরিশোধিত চিনি শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি দিয়েছে। গত এক দশকের মধ্যে এটি দেশটির প্রথম বড় পরিসরের চিনি আমদানির উদ্যোগ।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০ আগস্ট থেকে ভারত শুল্কমুক্ত চিনি আমদানির অনুমতি দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত চিনির দাম আরও বেড়েছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন অপরিশোধিত চিনির দাম প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ডলার বেড়েছে। স্থানীয় বাজারে দাম বাড়ার পেছনে এটিকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে গ্যাস-সংকটের কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ কমে যাওয়াও চিনির দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
রাজধানীর পুরান ঢাকার মৌলভীবাজার দেশের অন্যতম প্রধান চিনি পাইকারি বাজার। সোমবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশির ভাগ পাইকারি দোকানে চিনির মজুত কম।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে চিনি পাওয়া গেলেও আগের মতো সহজে বড় পরিমাণে পণ্য সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। খুচরা ক্রেতাদের কাছেও অনেক ক্ষেত্রে নগদ টাকায় চিনি বিক্রি করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজারের গুলবদন সুপারমার্কেটের পাইকারি চিনি ব্যবসায়ী ও মেসার্স ইয়াছিন স্টোরের স্বত্বাধিকারী এস এম শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘কোম্পানিগুলো আগে ২০-৩০ দিনের জন্য বাকিতে পণ্য দিত। কিন্তু এখন নগদ টাকা ছাড়া পণ্য দিচ্ছে না। এ জন্য বাজারে চিনির সরবরাহ কমেছে।’
চিনি উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের এক শীর্ষ কর্মকর্তাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারে সরবরাহ ধরে রাখতে বাকিতে চিনি বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।’
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম ও দেশের গ্যাস সরবরাহ—এই দুই বিষয়ের ওপরই এখন অনেকটা নির্ভর করছে স্থানীয় বাজারের পরিস্থিতি।
গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে দেশীয় কারখানাগুলোর উৎপাদন বাড়ানো কঠিন হবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত চিনির দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলে আমদানি ব্যয়ও বাড়বে।
ফলে উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দেশের বাজারে চিনির দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।