আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : মঙ্গলবার ২৫শে আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৮ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
পুলিশের ওপর হামলার মামলায় গতি নেই, বাড়ছে সদস্যদের হতাশা
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঘিরে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত পুলিশের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনায় দায়মুক্তির (ইনডেমনিটি) বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও পরবর্তী সময়েও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। এসব ঘটনায় মামলা হলেও অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা এবং বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ সূত্র বলছে, হামলার ঘটনায় করা অনেক মামলার তদন্ত দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। কোথাও কয়েকজন আসামি গ্রেপ্তার হলেও মূল হামলাকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। আবার তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হওয়ার পর নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ না হওয়ায় তদন্ত কার্যক্রমও থেমে আছে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের মধ্যে হতাশা ও মনোবল হারানোর প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
## দুই বছরে ৮০০-র বেশি মামলা
পুলিশ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ৫১৪টি ‘পুলিশ অ্যাসল্ট’ মামলা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে এ ধরনের আরও ৩১৭টি মামলা হয়েছে।
অর্থাৎ, ২০২৫ সাল ও চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মোট ৮৩১টি মামলা হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এসব মামলার বেশিরভাগেরই তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। কয়েকটি মামলায় আসামি গ্রেপ্তার এবং আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত হামলাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করার হার খুবই কম।
## হামলার পরও বিচার না হওয়ায় হতাশ পুলিশ
হামলার শিকার কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণ মানুষকে নিরাপদ রাখতে গিয়ে অনেক সময় নিজেরাই হামলার শিকার হচ্ছেন। কিন্তু হামলাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে না পারায় তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।
পুলিশ সদস্যদের অভিযোগ, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অপরাধের মামলা দ্রুত তদন্ত ও নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও পুলিশের ওপর হামলার মামলায় অনেক সময় তেমন তাগিদ দেখা যায় না।
তাদের ভাষ্য, কোনো মামলায় শুরুতে এক-দুজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরবর্তী সময়ে তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হলে তদন্ত কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে হামলার ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের উদ্যোগও অনেক ক্ষেত্রে থেমে যায়।
## ডিএমপি বলছে, জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গনি বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট অনেকটাই বদলে যায়। ওই সময় শুধু ঢাকায় নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, ডিএমপি এলাকায় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং অনেক আসামিকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
ওসমান গনি বলেন, ‘আমরা বেশ কিছু মামলার চার্জশিট দিয়েছি এবং দিচ্ছি। যারা জড়িত, তাদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।’
## ঢাকায় পুলিশের ওপর হামলার হার উল্লেখযোগ্য
পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশের তুলনায় ঢাকা মহানগর এলাকায় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্য।
২০২৫ সালে সারা দেশে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ৫১৪টি মামলা হলেও এর মধ্যে ঢাকা মহানগরেই হয়েছে ৮৮টি। অর্থাৎ, মোট মামলার প্রায় ১৭ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে রাজধানীতে।
ওই বছরের মার্চে সারা দেশে ৭৩টি ‘পুলিশ অ্যাসল্ট’ মামলা হয়। এর মধ্যে ঢাকায় হয়েছে ২৩টি, যা ওই মাসের মোট মামলার ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সারা দেশে ২৮টি মামলার মধ্যে ঢাকায় হয় ১০টি। ফেব্রুয়ারিতে ৩০টির মধ্যে সাতটি, এপ্রিলে ৪৫টির মধ্যে সাতটি এবং মে মাসে ৪৬টির মধ্যে নয়টি মামলা হয়।
জুনে সারা দেশে ৪৩টি মামলার মধ্যে ঢাকায় ছয়টি, জুলাইয়ে ৩৮টির মধ্যে চারটি, আগস্টে ৪৬টির মধ্যে পাঁচটি, সেপ্টেম্বরে ৩৯টির মধ্যে চারটি এবং অক্টোবরে ৬০টির মধ্যে নয়টি মামলা হয়। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ঢাকায় দুটি করে মামলা হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ৩১৭টি ‘পুলিশ অ্যাসল্ট’ মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরে হয়েছে ৪২টি।
এ বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে ৩৭টি মামলার মধ্যে ঢাকায় পাঁচটি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৪টির মধ্যে আটটি, মার্চে ৫৬টির মধ্যে সাতটি এবং এপ্রিলে ৬৩টির মধ্যে তিনটি মামলা হয়। মে মাসে ৪৬টির মধ্যে নয়টি, জুনে ৪৩টির মধ্যে ছয়টি এবং জুলাইয়ে ৩৮টির মধ্যে চারটি মামলা হয়েছে ঢাকায়।
## কেন মহানগরে হামলা বেশি?
ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাগুলো সব সময় সরাসরি পুলিশকে লক্ষ্য করে হয় না। আসামি গ্রেপ্তার কিংবা বিভিন্ন অভিযানে গেলে পুলিশ সদস্যরা হামলার শিকার হন।
তিনি বলেন, এসব ঘটনায় পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়। ঢাকায় জনসংখ্যা ও অপরাধের পরিমাণ বেশি হওয়ায় সারা দেশের তুলনায় রাজধানীতে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও কিছুটা বেশি হতে পারে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, ঢাকা ও অন্যান্য মহানগর ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় এখানে অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত এলাকা ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে। অনেক অপরাধীর প্রকৃত পরিচয়ও স্থানীয়দের জানা থাকে না। এ কারণে পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা বা দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার পর হামলাকারীদের শনাক্ত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
## হামলার কয়েকটি ঘটনায় তদন্তে ধীরগতি
সাম্প্রতিক কয়েকটি মামলা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, হামলার পর তাৎক্ষণিকভাবে কয়েকজনকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হলেও প্রত্যক্ষ হামলাকারী কিংবা ঘটনার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
গত ১৬ জুন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক এলাকায় একটি মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের দোকানে ঢুকে চাপাতির মুখে তিন লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় একটি অপরাধী চক্র। একই দিন আদাবরের তুরাগ হাউজিং এলাকায় ওই চক্রের একটি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ।
অভিযানের সময় ছিনতাইকারীদের হামলায় আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে আটক করা হলেও পরবর্তী সময়ে আর কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে জানা গেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হওয়ার পর নতুন তদন্ত কর্মকর্তাও নিয়োগ হয়নি।
এরপর গত ২৩ জুলাই রাতে মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ হাউজিং এলাকায় পুলিশের বিশেষ শাখায় কর্মরত এসআই ওসমান গনির ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওই মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল আসামি মো. সাঈদসহ আরও একজন পলাতক রয়েছেন।
গত ২৬ জুলাই রাজধানীর জুরাইনে সড়ক দখলমুক্ত করতে হকার উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে পুলিশের একটি দল হামলার মুখে পড়ে। ওই ঘটনায় দুজনকে আটক করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হলেও পরবর্তী সময়ে আর কোনো মামলা হয়নি।
## ঢাকার বাইরেও একই চিত্র
গত ১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্থানীয়দের হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। তবে এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি বলে জানা গেছে।
এর আগে গত ২৯ জুন জেলার সরাইল উপজেলার কালিকচ্ছ বাজার এলাকায় দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়াসহ অন্তত ২৫ পুলিশ সদস্য আহত হন। ওসির চোখে গুরুতর আঘাত লাগে। ওই ঘটনায় মামলা হলেও হামলায় জড়িতদের বেশিরভাগ এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।
সরাইল থানার ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়া বলেন, মামলাটি তদন্তাধীন। ঘটনার দিন হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্তের কাজ চলছে।
পিরোজপুরের কাউখালীতে গত ২০ আগস্ট পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায়ও মামলা হয়েছে। পাবনার সুজানগরের মথুরাপুরে সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মামলা হলেও সব আসামিকে এখনো আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন সুজানগর থানার ওসি মো. মোজাফফর হোসেন।
কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় গত ১৯ জুলাই ওয়ারেন্টভুক্ত এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে হাতকড়াসহ ওই আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় মামলা হলেও সব আসামি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি বলে জানিয়েছেন কুতুবদিয়া থানার ওসি মাহবুবুল হক।
## দ্রুত বিচার জরুরি
মাভাবিপ্রবির অধ্যাপক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, পুলিশের ওপর হামলার প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। দ্রুত বিচার হলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা নিজেদের নিরাপদ মনে করবেন এবং অপরাধ দমনে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় শুধু দৃশ্যমান হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না। হামলার পরিকল্পনা, উসকানি ও অর্থায়নের সঙ্গে জড়িতদেরও শনাক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, পুলিশের ওপর হামলার মামলার তদন্তে ধীরগতি সাধারণ মানুষের কাছেও ভুল বার্তা দিতে পারে। দ্রুত তদন্ত, সঠিকভাবে আসামি শনাক্ত এবং সময়মতো অভিযোগপত্র দাখিলের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া গেলে পুলিশের ওপর হামলার প্রবণতা কমবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মনোবলও বাড়বে।
পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হলেও দীর্ঘদিন তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে না যাওয়ার অভিযোগ তাই শুধু একটি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ মনোবলের বিষয় নয়; এটি সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।