উপকূলের লবণাক্ত পানিতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, ৫ জনে ১ জন হৃদ্‌রোগ-স্ট্রোকের ঝুঁকিতে

উপকূলের লবণাক্ত পানিতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, ৫ জনে ১ জন হৃদ্‌রোগ-স্ট্রোকের ঝুঁকিতে

উপকূলের লবণাক্ত পানিতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, ৫ জনে ১ জন হৃদ্‌রোগ-স্ট্রোকের ঝুঁকিতে

উপকূলীয় বাংলাদেশের ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের প্রতি পাঁচজনে একজন আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিতে রয়েছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে এ তথ্য উঠে এসেছে।

একই গবেষণায় উপকূলীয় এলাকার খাবার পানির উৎসে ব্যাপক লবণাক্ততার চিত্রও পাওয়া গেছে। খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস জরিপ করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০৩টি বা ২৪ দশমিক ২ শতাংশ উৎস খাবার পানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব খাবার পানির উৎসের মধ্যে কয়রায় ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে।

‘বাংলাদেশে খাবার পানির লবণাক্ততা এবং স্বাস্থ্য: প্রমাণ, অভিযোজন এবং নীতিগত সমাধান’ শীর্ষক এক সেমিনারে গবেষণার প্রাথমিক এসব ফলাফল প্রকাশ করা হয়। আইসিডিডিআর,বি ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ উদ্যোগে রাজধানীর মহাখালীতে আইসিডিডিআর,বির সাসাকাওয়া মিলনায়তনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

৪০ বছরের বেশি বয়সীদের হৃদ্‌রোগ-স্ট্রোকের ঝুঁকি

গবেষণার একটি অংশে কয়রা ও আশাশুনি উপজেলার ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জন প্রাপ্তবয়স্কের হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়।

এতে দেখা যায়, ২১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার হৃদ্‌রোগ কিংবা স্ট্রোকের ঝুঁকি রয়েছে। এর মধ্যে কয়রায় এ হার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

তবে গবেষকেরা পানির লবণাক্ততা ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির মধ্যে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক দাবি করেননি। গবেষণায় উপকূলীয় এলাকায় খাবার পানিতে লবণাক্ততার উপস্থিতি এবং একই জনগোষ্ঠীর মধ্যে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকির উচ্চ হার—দুটি বিষয় আলাদাভাবে উঠে এসেছে।

গবেষকদের মতে, পানিতে থাকা সোডিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

২৭ হাজারের বেশি পানির উৎস জরিপ

গবেষণার আওতায় কয়রা ও আশাশুনি উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিকের অধীন ১৭২টি গ্রামের পানির উৎস জরিপ করা হয়। দুই উপজেলায় মোট ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস পরীক্ষা করা হয়েছে।

গবেষণার বাংলাদেশ কর্মসূচির প্রাথমিক ফলাফল উপস্থাপন করেন আইসিডিডিআর,বির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলিয়া নাহিদ। তিনি জানান, গবেষণাটি ২০২৩ সালে শুরু হয়েছে এবং আগামী বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

খাবার পানির উৎসে লবণাক্ততার হার কয়রায় আশাশুনির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পাওয়া গেছে।

লবণাক্ত পানি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

সেমিনারে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিইনিস বলেন, খাবার পানির লবণাক্ততার জন্য এখনো নির্দিষ্ট কোনো স্বাস্থ্যভিত্তিক সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। পানিতে থাকা সোডিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদানের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণা করে উপযুক্ত নির্দেশিকা তৈরি করা প্রয়োজন।

অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে উপকূলীয় এলাকার পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎস দীর্ঘ সময় লবণাক্ত থাকতে পারে। তাই দুর্যোগের পর দ্রুত পানির উৎস পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উপকূলীয় বাঁধের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাঁধ উঁচু করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ নেই। তবে আইসিডিডিআর,বির বিভিন্ন গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক উঠে এসেছে এবং উপকূলীয় এলাকায় স্বাস্থ্য সমস্যা ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।

নিরাপদ পানির ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্ব

গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে কম লবণাক্ত ও নিরাপদ খাবার পানির প্রাপ্যতা বাড়াতে একটি সমন্বিত কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।

এই কর্মসূচির আওতায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুরের পানি ফিল্টার করার ব্যবস্থা, টিউবওয়েলের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং পানির উৎসের ডিজিটাল নিবন্ধন ও নজরদারির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এর পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের স্ক্রিনিং, চিকিৎসা, রেফারেল ও ফলোআপ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের তাগিদ

সেমিনারে বক্তারা বলেন, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও এর সমাধানে প্রয়োজনীয় আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।

কখনো এসব বিষয়কে স্বাস্থ্য সমস্যা, কখনো পরিবেশগত সমস্যা আবার কখনো জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা হিসেবে আলাদাভাবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সমস্যার মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম বলেন, খাবার পানির লবণাক্ততা একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়। এ সমস্যা মোকাবিলায় পরিবেশ, স্বাস্থ্য, পানি ও স্থানীয় সরকার খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানের সভাপতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হৃদ্‌রোগ ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের বৃদ্ধি বড় ধরনের সমস্যা। এসব রোগের ঝুঁকি কমাতে সরকারের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

সেমিনারে পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ ও তথ্য আদান-প্রদান জোরদার, খাবার পানিতে সোডিয়ামের স্বাস্থ্যভিত্তিক নির্দেশিকা প্রণয়ন, পানির উৎসের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ পানির কার্যক্রমকে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আনন্দ বাংলা