আনন্দ বাংলা
আনন্দ বাংলা
আপডেট : সোমবার ২৪শে আগস্ট ২০২৬, ০৭:০৮ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
সমালোচকদের ‘জঘন্য’, নেটফ্লিক্সে ‘হিট’—বাংলাদেশে শীর্ষে ‘ককটেল ২’
হোমি আদাজানিয়া পরিচালিত ‘ককটেল ২’ গত জুনে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর গড়পড়তা ব্যবসা করেছিল। তবে সিনেমাটি নিয়ে সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ নেতিবাচক। অনেকেই ছবিটিকে ‘জঘন্য’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর যেন পুরো চিত্রই পাল্টে গেছে।
গত সপ্তাহে নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর ‘ককটেল ২’ প্ল্যাটফর্মটির বৈশ্বিক অ-ইংরেজি সিনেমার শীর্ষ ১০-এর তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে সিনেমাটি উঠে এসেছে তালিকার শীর্ষে। ফলে প্রেক্ষাগৃহে গড়পড়তা সাড়া পাওয়া ছবিটি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে এসে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ককটেল’ ছিল সে সময়ের অন্যতম আলোচিত রোমান্টিক ড্রামা। সাইফ আলী খান, দীপিকা পাড়ুকোন ও ডায়না পেন্টি অভিনীত সিনেমাটিতে বন্ধুত্ব, প্রেম, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আধুনিক শহুরে জীবনের গল্প দর্শকদের আকৃষ্ট করেছিল। ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন হোমি আদাজানিয়া।
১৪ বছর পর নির্মিত ‘ককটেল ২’ অবশ্য আগের সিনেমার সরাসরি সিক্যুয়েল নয়। একই ধরনের সম্পর্কের জটিলতা ও আবেগকে নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়েছে এবারের ছবিতে।
প্রথম সিনেমাটি ইউ/এ সার্টিফিকেট পেলেও ‘ককটেল ২’ পেয়েছে ‘এ’ সার্টিফিকেট। সম্পর্ক, আবেগ ও প্রাপ্তবয়স্ক বিষয়বস্তুর উপস্থিতিও এবারের সিনেমায় তুলনামূলক বেশি।
প্রথম ‘ককটেল’-এর গল্পের বড় অংশজুড়ে ছিল বৃষ্টিভেজা লন্ডন। আর নতুন সিনেমার গল্পের পটভূমি ইতালির সিসিলি। রোদঝলমলে পাহাড়, সমুদ্র, বিলাসবহুল বাড়ি ও ফ্যাশনেবল পোশাক—সব মিলিয়ে সিনেমাটির ভিজ্যুয়াল আয়োজন বেশ জমকালো।
সিনেমার গল্পের কেন্দ্রে কুনাল ও দিয়া। চরিত্র দুটিতে অভিনয় করেছেন শহীদ কাপুর ও রাশমিকা মান্দানা। দীর্ঘদিনের সম্পর্কে থাকা এই জুটি প্রায় এক দশক ধরে একসঙ্গে বসবাস করছে।
করোনাকালের কঠিন সময় কিংবা বিয়ের সামাজিক চাপ—কোনো কিছুই তাদের সম্পর্ককে ভাঙতে পারেনি। কিন্তু একটি সাধারণ রসিকতাই দিয়ার মনে সন্দেহের জন্ম দেয়।
কুনাল মজা করে বলে, সে যদি কখনো দিয়ার সঙ্গে প্রতারণা করে, তাহলে দিয়া তা জানতে পারবে না। কথাটি দিয়ার মনে এমনভাবে দাগ কাটে যে নিজের প্রেমিকের প্রতি তার বিশ্বাসে চিড় ধরে।
পরে সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা হিসেবে তারা ইতালির সিসিলিতে ছুটি কাটাতে যায়। সেখানেই তাদের জীবনে ফিরে আসে দিয়ার পুরোনো বন্ধু অ্যালি। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন কৃতি শ্যানন।
অ্যালি স্বাধীনচেতা এবং বিয়ে কিংবা স্থায়ী সম্পর্কে খুব একটা বিশ্বাসী নয়। সিসিলিতে সে নাচ শেখায়। এর আগে বারটেন্ডার হিসেবেও কাজ করেছে।
কুনাল সত্যিই তাকে ভালোবাসে, নাকি এত বছরের সম্পর্ক কেবল অভ্যাসে পরিণত হয়েছে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দিয়া অদ্ভুত এক সিদ্ধান্ত নেয়।
সে অ্যালিকে কুনালকে প্রলুব্ধ করার দায়িত্ব দেয়। উদ্দেশ্য, কুনালের বিশ্বস্ততা পরীক্ষা করা। অ্যালি প্রথমে বিষয়টিকে নিছক অভিনয় হিসেবে নিলেও একপর্যায়ে সত্যিই কুনালের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এরপরই শুরু হয় সম্পর্কের জটিলতা।

সিনেমাটি আধুনিক প্রেমের গল্প বলার চেষ্টা করলেও পুরুষতান্ত্রিক রোমান্টিক ধারণাকে নতুন মোড়কে উপস্থাপন করেছে বলে সমালোচনা করেছে ‘দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়া’।
তাদের মতে, সিনেমাটিতে তারকা, চাকচিক্য ও বিদেশি লোকেশনের অভাব নেই; কিন্তু প্রেমের গল্পে আবেগ ও প্রাণের ঘাটতি রয়েছে। দিয়ার চরিত্রের আচরণও একপর্যায়ে দর্শকের কাছে বিরক্তিকর হয়ে ওঠে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
ভারতীয় আরেক গণমাধ্যম সিনেমাটিকে ২.৫ স্টার দিয়ে রিভিউ করেছে। তাদের মতে, মজার পরিস্থিতি তৈরি করতে গিয়ে সম্পর্কের জটিলতাকে অনেক সময় নিছক রসিকতায় পরিণত করেছে সিনেমাটি।
তবে সিনেমার ভিজ্যুয়াল নিয়ে প্রশংসা এসেছে। বিশেষ করে সিসিলির লোকেশন, রং, পোশাক ও চিত্রগ্রহণের প্রশংসা করেছে এনডিটিভি। তবে তাদের মতে, ছবির বাহ্যিক সৌন্দর্যের আড়ালে আবেগের জায়গাটি অনেকটাই ফাঁকা।
তিন অভিনয়শিল্পী শহীদ কাপুর, রাশমিকা মান্দানা ও কৃতি শ্যাননের অভিনয়ের প্রশংসাও করেছে এনডিটিভি।
দ্য হিন্দুও সিনেমাটিকে ২.৫ স্টার দিয়েছে। তাদের ভাষ্য, আগের ‘ককটেল’-এর আবেগ, তীক্ষ্ণতা ও চরিত্রের গভীরতার তুলনায় নতুন সিনেমাটি অনেকটাই পিছিয়ে। সিনেমাটিতে নারী চরিত্রের কণ্ঠ অনেকটা চাপা পড়ে গেছে এবং কুনালকে প্রায় নিষ্পাপ ও আদর্শ প্রেমিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও সমালোচনা করেছে গণমাধ্যমটি।
সমালোচকদের নেতিবাচক মন্তব্যের বিপরীতে বাংলাদেশে ‘ককটেল ২’-এর জনপ্রিয়তা বেশ চোখে পড়ার মতো। নেটফ্লিক্সের বাংলাদেশি টপচার্টে সিনেমাটির শীর্ষে উঠে আসার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে।
প্রথমত, ২০১২ সালের ‘ককটেল’ সিনেমাটির জনপ্রিয়তা নতুন ছবিটির প্রতি দর্শকের আগ্রহ তৈরি করে থাকতে পারে।
দ্বিতীয়ত, রাশমিকা মান্দানার জনপ্রিয়তাও বড় কারণ হতে পারে। বাংলাদেশে এই অভিনেত্রীর আলাদা একটি দর্শকগোষ্ঠী রয়েছে। নতুন সিনেমায় তার আগের ‘পাশের বাড়ির মেয়ে’ ধরনের ইমেজের বাইরে ভিন্ন উপস্থাপনাও দর্শকদের আগ্রহী করে তুলতে পারে।
এ ছাড়া বর্তমান সময়ের প্রেম, লিভ-ইন সম্পর্ক, বিশ্বাস, সন্দেহ ও সম্পর্কের টানাপোড়েনের মতো বিষয় তরুণ দর্শকদের কাছে সিনেমাটিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
অবশ্য বাংলাদেশের সবাই যে সিনেমাটি পছন্দ করেছেন, তা নয়। অনেক দর্শক সিনেমাটি দেখে বিরক্তি ও হতাশার কথাও জানিয়েছেন। আবার সমালোচকদের নেতিবাচক রিভিউও কৌতূহল তৈরি করে অনেককে সিনেমাটি দেখতে আগ্রহী করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রেক্ষাগৃহে গড়পড়তা সাড়া পাওয়া ‘ককটেল ২’ নেটফ্লিক্সে এসে নতুন জীবন পেয়েছে। সমালোচকদের রায়ে সিনেমাটি যতটা পিছিয়ে, দর্শকের অনলাইন আগ্রহে ততটাই এগিয়ে—আর বাংলাদেশে তার প্রমাণ মিলছে টপচার্টের শীর্ষস্থানেই।
আনন্দ বাংলা